Page

Follow

অবরােহ পন্থার মাধ্যমে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা এবং ঈশ্বরের সম্বন্ধে কিছু জানা – প্রামাণিক ভিত্তি|| Page-132

  অবরােহ পন্থার মাধ্যমে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা এবং ঈশ্বরের সম্বন্ধে কিছু জানা   – প্রামাণিক ভিত্তি




 প্রমাণ তিন রকমের ঃ ১. প্রত্যক্ষ, ২. অনুমান ৩. শব্দ।


 ১. প্রত্যক্ষ প্রমাণ- ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতালব্ধ প্রত্যক্ষণ (Empirical Sensual Perception) : সরাসরি ইন্দ্রিয় দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ করে এই জ্ঞান লাভ হয়। প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছয় প্রকার ঃ (১) ঘ্রাণজ (নাক দ্বারা লব্ধ) (২) শ্রাবণ (কান দ্বারা লব্ধ) (৩) রাসন (জিভ) (৪) চাক্ষুষ (চোখ) (৫) স্পর্শ (ত্বক ) (৬) মানস (মনােজাত)। 


শ্রীল জীব গােস্বামী বিদ্বান বা বিজ্ঞানীর জ্ঞানকে (১) বৈদুষ এবং অজ্ঞের জ্ঞানকে (২) অবৈদুষ এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু এই প্রত্যক্ষজ প্রমাণ সীমাবদ্ধ, কেননা ইন্দ্রিয়গুলিই সীমাবদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ। যেমন প্রকৃতির ‘নিউট্রিনাে' কণিকা বা এক্স-রে রশ্মি ইন্দ্রিয় দ্বারা বােঝা যায় না। অর্থাৎ আমাদের ইন্দ্রিয়ের অজ্ঞাত আরও বহু কিছু থাকতে পারে, যা আমরা জানতে পারি না 


স্থুল জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা পরম সত্য অবগত হওয়া যায় না —চারটি মৌল ত্রুটি এর কারণ ঃ

(১) ভ্রম (Propensity to commit mistake) 

ভুল করার প্রবণতা।


 (২) প্রমাদ (Delusion)

— মােহগ্রস্ত হবার প্রবণতা। 


(৩) বিপ্রলিপ্সা (Propensity to cheat) 

– প্রতারণা করার প্রবণতা 

(বহু আনুমানিক সিদ্ধান্তকে আজকাল ‘বিজ্ঞান’ বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে এই ত্রুটির জন্য) 


(৪) করণাপাটব 

(করণ ইন্দ্রিয়;Imperfect senses) 

অপূর্ণ বা ত্রুটিমুক্ত ইন্দ্রিয়জাত ভ্রান্তি)। 


এইসব ত্রুটির জন্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব  বা মতবাদগুলি ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে , আর এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে।' 



২. অনুমান প্রমাণ (Theories based on evidence) ঃ

ইন্দ্রিয়গুলি প্রত্যক্ষণ-এর মাধ্যমে যে তথ্য আনে, সেগুলির উপর ভিত্তি করে গৃহীত আনুমানিক সিদ্ধান্ত এই পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু এই পদ্ধতি কেবলই অনুমান বা কল্পনা-নির্ভর, সেজন্য তা ভ্রান্তিপূর্ণ হতেই পারে;অনুমান প্রকৃত বাস্তবতা থেকে আলাদা হতে পারে। 


পাঁচ অন্ধের হস্তী দর্শন’ অর্থাৎ হাতে স্পর্শ করে ‘হাতি কুলাের মতাে’, ‘থামের মতাে' ইত্যাদি অনুমান এই পর্যায়ভুক্ত। যেমন, অনুমান করা হয় যে একটি প্রজাতি বিবর্তিত হয়ে আরেকটি প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যদিও আজও মানুষের ইতিহাসে কেউ কখনাে প্রাকৃতিক নির্বাচন বা ন্যচারাল সিলেকশানের মাধ্যমে একটিও নতুন প্রজাতির উদ্ভব হতে দেখে নি। 


একটি দৃষ্টান্ত : সূর্যকে ভােরে স্নিগ্ধ, দুপুরে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও তেজোদ্দীপ্ত, সায়াহ্নে ম্রিয়মান  দেখায়। এই প্রত্যক্ষের ভিত্তিতে শিশুরা বা অজ্ঞ মানুষেরা সূর্যকে স্নিগ্ধ, উত্তপ্ত বা ম্রিয়মান বলে অনুমান করতে পারেন, কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে সূর্য সবসময়েই একই রকম উত্তপ্ত, তেজোদ্দীপ্ত।


 অনুমান বাস্তব সত্য থেকে ভিন্ন হতে পারে। তাই জল্পনা দ্বারা (Speculative reasoning) পরম সত্যে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়, কেবল কল্পনার বৃত্তেই ঘুরতে হয় অবিরাম। এছাড়া জড় ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণও জড়, এর পরিপ্রেক্ষিতে করা অনুমানগুলিও জড়ধর্মী।।


 3. শব্দ প্রমান (Aural reception of knowledge - from a bonafide authority):

যথার্থ জ্ঞান, শাশ্বত পরমসত্য (Eternal Absolute Truth) শব্দের মাধ্যমে ভগবান হতে পরম্পরাক্রমে প্রবাহিত হয় —এটিই যথার্থ জ্ঞান-স্থানান্তর বা নলেজ-ট্রান্সফার -এর আদর্শ পন্থা। এই জ্ঞান নির্ভুল, কেননা তা আসছে পরমেশ্বর ভগবান হতে। বেদ শব্দের অর্থ জ্ঞান, এবং বেদের অপর নাম শ্রুতি , অর্থাৎ শ্রবণের মাধ্যমে যে জ্ঞান প্রবাহিত হয়। বেদ কারাে রচিত নয়, এটি ‘অপৌরুষেয় এবং শব্দ প্রমাণ বেদ অভ্রান্ত শাশ্বত জ্ঞানভান্ডার-স্বরূপ।।



কেবল ভগবানই প্রদান করতে পারেন পূর্ণ জ্ঞান

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণজ্ঞানস্বরূপ ও জীব, জগৎসহ প্রকাশিত বা ব্যক্ত ও অব্যক্ত, সব কিছুর উৎস। তাই তিনি সব কিছু পূর্ণরূপে অবগত, সর্বজ্ঞ । যেমন ভারতে পরমাণু রি-অ্যাক্টরে বিদ্যুৎ তৈরী হচ্ছে কিভাবে সে সম্বন্ধে সবচেয়ে ভালভাবে বলতে পারবেন সংশ্লিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী। পরমপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বদ্ধজীবকে অপ্রাকৃত দিব্যজ্ঞান দানের জন্য দুটি ব্যবস্থা করেছেনঃ ১. বেদ ও বেদানুগ শাস্ত্র—যা ইনস্ট্রাকশান ম্যানুয়াল বা নির্দেশিকা, এবং ২. পরম্পরা ধারা (disciplic.succession)।



পরম্পরা ধারা।

 পরম সত্যের জ্ঞান মানবসমাজে বহমান রাখার পন্থা। 


ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন, তিনি ভগবদগীতার শাশ্বত জ্ঞান সূর্যের অধিপতি দেবতা বিবস্বানকে, বিবস্বান মানবজাতির পিতা মনুকে, মনু পৃথিবীর অধীশ্বর মহারাজ ইক্ষবাকুকে প্রদান করেন, এই ভাবে রাজর্ষিগণের মাধ্যমে সেই জ্ঞান প্রবাহিত হতে থাকে—এবং পরম্পরা প্রাপ্তং ইমং রাজর্ষয়ে বিদুঃ (৪/২)।

 যিনি অধ্যাত্মতত্ত্বজ্ঞান একজন প্রামাণিক তত্ত্ববেত্তার কাছ থেকে লাভ করেছেন, তিনি একজন যােগ্য শিষ্যকে দান করেন। তিনি তার পরবর্তীকে এইভাবে গুরু শিষ্য পরম্পরা (disciplic Succession) ধারায় জ্ঞান প্রবাহিত হয়।



অধ্যাত্মশিক্ষক (Preceptor of Spiritual Science) -এর যােগ্যতা


 আদর্শ গুরুদেব হবেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পরম্পরা ধারায় যুক্ত ও সংযতেন্দ্রিয় ও নিঃস্বার্থ • আচার্য—অর্থাৎ কেবল উপদেশ দেওয়া নয়, নিজে আচরণ করে দেখাবেন • ষড়বেগজয়ী (বাক্য-ক্রোধ-জিহ্বা -মন-উদর ও উপস্থবেগ) • সত্যনিষ্ঠ • শাস্ত্র তত্ত্ববেত্তা * সকলের সুহৃদ • অনিন্দুক * সর্বজীবের কল্যাণকামী *মনােধর্মী জল্পনা-মুক্ত , অবিকৃতভাবে গুরুদেবের মাধ্যমে লন্ধ তত্ত্বজ্ঞানের প্রচারক।।


জ্ঞান গ্রহণের যােগ্যতা 


পূর্ণজ্ঞান, দিব্য উপলব্ধি লাভ করতে হলে গ্রহীতার অবশ্যই কিছু যােগ্যতা অর্জন করতে হবে :

• আন্তরিক হৃদয়ে বিনীত ভাবে পারমার্থিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসার মনােভাব 

• শ্রবণের আগ্রহ 

• নিষ্কপট মনােবৃত্তি 

• সেবার মনােভাব। 

০ পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তি 

• গুরুদেবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা 

• গুরুদেবের আদেশ পালনে উন্মুখতা ।

• অসূয়া বা ঈর্ষা-হিংসা-বিদ্বেষ প্রভৃতি নেতিবাচক মনােবৃত্তি-শূন্যতা।।


 চেতন সাম্রাজ্যের জ্ঞান লাভ হয় চেতনার উৎকর্ষণ–শ্রদ্ধা, সম্ভ্রম দ্বারা।


 শ্রদ্ধাবান জ্ঞান লাভ করেন, সংশয়ী বিনাশপ্রাপ্ত হয়।


শ্রদ্ধা ও বিনয় – ব্রহ্মবিদ্যা, ভগবতত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য অপরিহার্য। এই জ্ঞান লাভের পদ্ধতি জড় জ্ঞান লাভের অনুরূপ নয় ভগবদগীতায় অর্জুন আদর্শ শ্রোতা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আদর্শ বক্তা। অর্জুনকে ভগবান বলেন, শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয় – শ্রদ্ধাবান তৎপর ও সংযতেন্দ্রিয় ব্যক্তিরা জ্ঞান লাভ করতে পারেন (ভ.গী-৪/৩৯)। 


সংশয়াত্মা বিনশ্যতি – সংশয়ী, দাম্ভিক, নাস্তিকেরা বিনষ্ট হয়। সেইজন্য শ্রীকৃষ্ণ বলেন —তদবিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। প্রণাম, সেবা ও সশ্রদ্ধ জিজ্ঞাসার দ্বারা তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করে তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান গ্রহণ করা উচিত।


 যে অন্ধ, সে পৌঁছাতে পারে না নির্দিষ্ট গন্তব্যে, চক্ষুষ্মনের সাহায্য ছাড়া। যে গভীরকূপে পড়ে গেছে, সে নিজেকে উত্তোলন করতে পারেনা একাকী। যে নৌকা গভীর সমুদ্রে দিক হারিয়েছে, একজন সুদক্ষ কর্ণধার বা মাঝির সাহায্য ছাড়া সে ফিরে আসতে পারে না গন্তব্যে। সেজন্য, যার পারমার্থিক জ্ঞান।

নেই, তার প্রথম কর্তব্য একজন ভগবৎ তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তির নিকট ভগবৎ-প্রদত্ত জ্ঞান গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তােলা।


 এটি বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ। কুরুক্ষেত্র-প্রান্তরে মহাবীর অর্জুন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিকট আত্মসমর্পণ করে পেতে চান জীবনের পথ-নির্দেশ ‘হে কেশব! আমি তােমার শিষ্য, তােমার শরণাগত, শিষ্যস্তেহং’। আত্ম-অহমিকা বিসর্জন দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বা তার সুযােগ্য প্রতিনিধির নিকট আত্মসমর্পণ জীবনে সমস্যামুক্ত হবার প্রথম সােপান। শ্রীমদ্ভাগবত (১১/৩/২১) : 

“অতএব কেউ যদিআন্তরিকভাবে প্রকৃত আনন্দ কামনা করেন, তা হলে তাকে দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একজন সদ্গুরুর আশ্রয় অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। সদগুরুর যােগ্যতা হচ্ছে যে, তিনি গভীরভাবে শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করেছেন এবং অন্যদেরও সেই সব সিদ্ধান্ত বিষয়ে প্রত্যয় উৎপাদন করতে সক্ষম। যারা জড় সুখসুবিধাকে অগ্রাহ্য করে পরমেশ্বরের শরণ গ্রহণ করেছেন, সেই ধরণের মহান ব্যক্তিদেরই যথার্থ গুরু বলে বুঝতে হবে।”




Click Here >>>Subscribe






Comments

y3

yX Media - Monetize your website traffic with us Monetize your website traffic with yX Media Monetize your website traffic with yX Media

This Blog is protected by DMCA.com

Subscribe

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

Email Subscription

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

sharethis-inline