Page

Follow

জিন-ম্যাপঃ হিউম্যান জিনােম প্রােজেক্ট || Page-87

  জিন-ম্যাপঃ হিউম্যান জিনােম প্রােজেক্ট




জিন-ম্যাপঃ হিউম্যান জিনােম প্রােজেক্ট

পৃথিবীর বৃহত্তম চিকিৎসা গবেষণায় অর্থবিনিয়ােগকারী-সংস্থা আমেরিকার ন্যাশন্যাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং একটি বায়ােটেক কোম্পানি সেলেরা জিনােমিক্স কর্পোরেশান মানুষের জিনের পূর্ণ মানচিত্র তৈরী করার জন্য জেনেটিক ল্যাংগুয়েজ ডিকোড করার কাজে হাত দেয় (১৯৯০-২০০১)। 


এই উচ্চাকাঙ্খপূর্ণ পরিকল্পনার নাম ‘হিউম্যান জিনােম প্রােজেক্ট, যার জন্য ব্যয় বরাদ্দ হয় ৩০০ কোটি ডলার বা ১৪ হাজার কোটি টাকা। এই বায়ােলােজিকাল বুক অব লাইফ', জেনেটিক ইনস্ট্রাকশান ম্যানুয়ালের নিদের্শলিপির পাঠোদ্ধারের জন্য ৬টি দেশের ইউনিভার্সিটি ও ল্যাবরােটারিতে ব্যাপক কর্মকান্ডে নিয়ােজিত হন ১,১০০ জীবতত্ত্ববিদ,শত শত কমপিউটার সায়েনন্টিস্ট এবং বিশেষজ্ঞ, সাহায্য নেওয়া হয় হাজার হাজার কমপিউটারের। 


গড়ে প্রতিদিন প্রতি মিনিটে এভাবে তাঁরা ১২,০০০ জেনেটিক লেটারের পাঠোদ্ধার করতে থাকেন – হিউমান জিনােমের সমগ্র অক্ষর (নিউক্লিওটাইড) সংখ্যা ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি।।


বিজ্ঞানীদের এই প্রােজেক্ট গ্রহণের প্রধান কিছু উদ্দেশ্য ছিল অনেক রােগের কারণ আবিষ্কার, নতুন চিকিৎসা ও রােগারােগ্যের উপায় সন্ধান এবং বার্ধক্য বা বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শ্লথ বা বিপরীতমুখী করা। নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের সংযােগে ইচ্ছামত মডেলের মানব শিশু (Designer babies) তৈরীর জেনেটিক প্রযুক্তি-রহস্য করায়ত্ত করা।


ফ্রান্সিস ক্রিকের সহযােগী DNA আবিষ্কারক নােবেল-লরিয়েট জেমস ওয়াটসন DNA --—কে “The ultimate description of life” বা জীবনের চুড়ান্ত বিবরণ বলে। মন্তব্য করেন। প্রােজেক্টের একজন প্রথমদিকের কর্ণধার বিজ্ঞানী ওয়াল্টার গিলবার্ট মন্তব্য করেন যে মানুষের DNA -তে পাওয়া ৩০০ কোটি নিউক্লিওটাইডের কোড-লিপি সহজেই একটি কমপ্যাক্ট ডিস্ক ভরে ফেলা যাবে, তখন বলা যাবে (তার কথায়) : “এখানে একজন আস্ত মানুষ—এই তাে আমি!” প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন হিউম্যান জিনােম সম্বন্ধে বলেন, “এটি সেই ভাষা, যা-দিয়ে ভগবান জীবন সৃষ্টি করেছেন।”



২০০১-এর ফেব্রুয়ারীতে ‘নেচার’ এবং সায়েন্স’ পত্রিকায় এবং যৌথ প্রেস কনফারেন্স এবং টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জিনােম রিসার্চ প্রােফেসরের দুটি টিম এই প্রােজেক্টের ফলাফলের যে রিপাের্ট প্রকাশ করলেন তা বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত” (“Unexpected'')। প্রবল ধাক্কা খেল ফ্রান্সিস ক্রিকের জিন-তত্ত্ব, “Central dogma” নামে যা  বিজ্ঞানী মহলে সুবিদিত।


 ১ লক্ষ বা তারও বেশি জিনের পরিবর্তে মানব কোষে পাওয়া গেল৩০ হাজার জিন। এর অর্থ হচ্ছে মানুষের জিন সংখ্যা সরষে গাছ (২৬ হাজার জিন) বা ঐ জাতীয় আগাছার জিনের সমান, এমনকি ফুট ফ্লাই জাতীয় পােকা বা কীটের দেহেও ১০-১৫ হাজার জিন রয়েছে। 


কমপ্যাক্ট ডিস্কে ভরা ওয়াল্টার গিলবার্টের জিনােমিক সিডি আর একটি  ইঁদুরের জিনােমিক সিডি যদি কোন অনবহিত পাঠক পড়েন, তাহলে সহজেই তিনি ইঁদুরের জিন সিডিকে গিলবার্টের বলে গুলিয়ে ফেলতে পারেন, কেননা ইদুরের ৯৯ শতাংশ জিনের প্রতিরূপ রয়েছে মানবীয় জিনােমে!


১৫ হাজার কোটি টাকার প্রােজেক্টের এই মর্মন্তুদ পরিণতিতে স্বভাবতঃই আশাহত বিজ্ঞানীমহল, ‘জেনেটিক ইঞ্জিনীয়াররা’,এবং অবশ্যই মর্মান্তিকভাবে প্রফেট-লােভী বায়ােটেক কোম্পানীটি। জিন-ম্যাপ প্রকাশ করল না জীবনের চূড়ান্ত রহস্য। রহস্য গভীরতর হল।।



নিউইয়র্ক টাইমসে নিকোলাস ওয়েড মন্তব্য করেন যে এই প্রােজেক্টের বিস্ময়কর ফলাফল “মানবীয় গর্বের উপর প্রভাব ফেলবে” এবং ভবিষ্যতের জিনােম গবেষণায় “মানবীয় আত্মমর্যাদায় আরও আঘাত আসতে পারে।” প্রােজেক্টের একজন কর্ণধার ডঃ এরিক ল্যান্ডার মানুষকে এর থেকে “বিনীত হবার শিক্ষা” (“A lesson in humility”) গ্রহণের পরামর্শ দেন।।


এই জিন-সরলীকরণের ধারণায় আঘাত খােদ বিবর্তনবাদের উপরেই এক বড় আঘাত। ইদুরের ও মানুষের জিনের নিকট সাদৃশ্য কি এটাই প্রমাণ করে যে ইদুর থেকে মানুষের উদ্ভব? বুদ্ধিমত্তার নির্দেশে অতিসূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট প্রােগ্রাম-এ উভয় প্রজাতির উদ্ভব, বিজ্ঞানীরা তার প্রমাণ পাচ্ছেন, কিন্তু হদিশ পাচ্ছেন না সেই প্রােগ্রামিং -এর পদ্ধতির মরিয়া চেষ্টা সত্ত্বেও। সেইজন্য অমর হওয়া, বয়ােবৃদ্ধিকে স্তব্ধ বা বিপরীত দিকে চালনা (To slow or reverse the aging process) ইত্যাদি উচ্চাকাঙ্খকে আপাতত তাকবন্দী করে রাখা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই তাদের কাছে। 


ফ্রেব্রুয়ারী ২০০১ -এর সায়েন্স’ পত্রিকায় ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে যে মানুষের জিনের প্রায় ৮০% জিন “Alternatively spliced” বা বিকল্পরূপে জোড়-বদ্ধ।”এই ‘বিকল্প জোডবন্ধন’পদ্ধতি প্রযুক্ত হওয়ায় জেনেটিক কোডের মূল্যমান শত শত গুণে বেড়ে যায়; কম জিনে বেশি ভাষা সংরক্ষিত করা যায়। যেমন মানুষের অন্তঃকর্ণের একটি মাত্র জিন একটি প্রােটিনের সংকেত বহনের পরিবর্তে এই ‘অলটারনেটিভ স্পাইসিং’প্রক্রিয়ায় ৫৭৬টি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অ্যামাইনাে অ্যাসিড সিকোয়েন্স-যুক্ত প্রােটিন তৈরীর সংকেত লিপিবদ্ধ রাখে।


এবিষয়ে রেকর্ড করেছে ফ্রুট ফ্লাই -এর একটি জিন উৎপন্ন করে ৩৮,০১৬ টি ভিন্ন ভিন্ন সুনির্দিষ্ট প্রােটিন অণু তবুও, জিনই যে মানুষের সকল স্বভাব, বৈশিষ্ট্য, চিন্তাধারা, রুচি, আবেগ, ব্যক্তিত্বের বিশিষ্টতা, কাব্য-শিল্পবােধ, চেতনাগত পার্থক্যের কারণ – মেলেনি তার প্রমাণ। জিনকোড তাই দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সংকেতলিপি বহন করতে পারে, কিন্তু পূর্ণ ব্যক্তিত্বের পরম ধারক জিন – এই মিথকে ভেঙ্গে দিয়েছে বিজ্ঞান।।


২০০১-এর ১৬ই ফেব্রুয়ারী স্যানফ্রান্সিসকো, ক্রোনিকল পত্রিকা “Human Genome! Map: Scientists Talking About the Divine” নামে একটি  আর্টিকল প্রকাশ করে, যেখানে জিন মাইয়ারস -এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। জিন মাইয়ারস্ হচ্ছেন সেরেলা জিনােমিকসের মেরিল্যান্ড হেডকোয়ার্টারের কমপিউটার সায়েন্টিস্ট এবং তিনিই প্রকৃতপক্ষে অন্যদের সাহায্য নিয়ে জিনােম ম্যাপিং বা জিন মানচিত্র তৈরীর কাজটি করেন। 


সাক্ষাৎকারে মাইয়ার্স বলেন ঃ “We are deliciously complex at the molcular level .... We don't understand ourselves yet, which is cool. There is still a metaphysical, magical element. ...... what really astounds me is the architecture of life .... the system is complex. It's like was designed." 


অর্থাৎ আমাদের দেহ আণবিক স্তরেই অত্যন্ত জটিল – আমরা এখনাে নিজেদের দেহকে বুঝতে পারিনি – যা এক শীতল রহস্য। এক অতিপ্রাকৃত অলৌকিক উপাদান রয়েছে ....। আমাকে যা হতভম্ব করছে, তা হচ্ছে জীবনের স্থাপত্য শিল্প.....। ব্যবস্থাটা এতই জটিল যে মনে হয় এটি পরিকল্পিতভাবে কারও দ্বারা ডিজাইন করা হয়েছে।”


২০০৬-এ এই হিউম্যান জিনােম প্রােজেক্টের কাজ শেষ হল তৈরী হল, জিন ম্যাপ। এতে কি এই প্রােজেক্টের বিজ্ঞানীরা সবই জিন-ঘটনাচক্রের ফল’ সচক্ষে দেখে নাস্তিক হয়ে গেলেন? বরং সম্পূর্ণ বিপরীতটাই ঘটল। প্রােজেক্টের কর্ণধার বা প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস কলিন্স পুরাে একটি বই লিখে ফেললেন, 


‘The Language of God', পৃথিবীর মানুষকে একথাই জানাতে যে এই বিস্ময়কর জেনেটিক ইনফরমেশান কোডে লেখা এই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও অসম্ভব নিখুঁত এই ভাষা প্রজাতি-সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত ভগবানের ভাষা, ল্যাংগুয়েজ অব গড়।

এইভাবে, সূক্ষ্মতম স্তরে গিয়ে বিজ্ঞান পরমপুরুষ পরমেশ্বর ভগবানের মহান ও অননুকরণীয় শিল্প-কুশলতার নিদর্শন পাচ্ছে। সেই দিন আর বেশি দূরে নেই, যখন বিজ্ঞানে ভগবানের নামােচ্চারণ ট্যাবু’ বা সর্বৈব নিষিদ্ধ –এই কুসংস্কার থেকে সরে আসতে বিজ্ঞানই মানুষকে বাধ্য করবে।




Click Here >>>Subscribe






Comments

y3

yX Media - Monetize your website traffic with us Monetize your website traffic with yX Media Monetize your website traffic with yX Media

This Blog is protected by DMCA.com

Subscribe

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

Email Subscription

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

sharethis-inline