Follow

অপ্রকৃত জগৎ ঃ আমাদের আপন আলয়, পরম আশ্রয়স্থান। PAGE-233

  অপ্রকৃত জগৎ ঃ আমাদের আপন আলয়, পরম আশ্রয়স্থান। 



ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৩৭)বর্ণনা করা হয়েছে পরমেশ্বর ভগবানের একটি অপ্রাকৃত দিব্য- চিন্ময় ধাম রয়েছে, যার নাম গােলক, যেখানে তিনি নিত্য বিরাজমান এবং আনন্দময় লীলা বিলাসে মগ্ন। যেখানে তিনি অগণিত শুদ্ধ ভক্তগণ পরিবৃত ;তারা তার নিত্য লীলসহচর।।


 কিন্তু এইভাবে তিনি নিরন্তর দিব্যানন্দে নিমগ্ন থাকলেও তিনি একই সংগে তার অনন্ত শক্তিরাজির মাধ্যমে, এবং তার প্রকাশসমূহের মাধ্যমে তিনি জড় ও চিন্ময় সমগ্র সৃষ্টির সর্বত্রই বিদ্যমান (গােলক এব নিবসতি অখিলাত্মভূতঃ ব্রহ্মসংহিতা ৫/৩৭)। বিষ্ণুপুরাণে তার শক্তিরাজিকে অগ্নি হতে নিঃসৃত তাপ ও আলােকের সংগে তুলনা করা হয়েছে ।


 অগ্নি এক স্থানে স্থিত থাকলেও এটি তাপ ও আলােকরশ্মি বিকিরণ করে;বহু দূর হতেও অগ্নিনিঃসৃত আলােক রশ্মি দেখা যায়। ঠিক তেমনি পরমেশ্বর ভগবান তার অপ্রাকৃত ধামে নিত্য বিদ্যমান থাকলেও তিনি সর্বত্র তার বিভিন্ন শক্তিরাজিকে বিচ্ছুরিত করতে পারেন।


 ভগবদগীতায় ১৫শ অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকে পরমেশ্বর দিব্য ধামের বর্ণনা করা হয়েছেঃ

“সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি বা বিদ্যুৎ আমার সেই পরম ধামকে আলােকিত করতে পারে না। সেখানে গেলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।'

এই শ্লোকে সেই শাশ্বত চিদাকাশের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে চিন্ময় জগৎ, অপ্রাকৃত ভগবদ্ধাম বিরাজিত। 


অবশ্য, আকাশ সম্বন্ধে কিছু ধারণা আমাদের রয়েছে, আর সূর্য, চন্দ্র, তারা ইত্যাদির সংগে সম্বন্ধযুক্ত করে আকাশের কথা ভাবতে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু এই শ্লোকে ভগবান বর্ণনা করছেন, সেই শাশ্বত আকাশে সূর্য, চন্দ্র, বিদ্যুৎ, বা কোন রকম অগ্নির আলােকের প্রয়ােজন হয়না, কেননা চিদাকাশের সমস্ত গ্রহলােকগুলি ব্ৰহ্মজ্যোতির, পরমেশ্বর ভগবানের অঙ্গ-নিঃসৃত চিন্ময় জ্যোতিঃ প্রভা, দিব্য ভগবৎ-অঙ্গঃকান্তি দ্বারা উদ্ভাসিত। আমরা এই জড় জগতের অন্যান্য গ্রহগুলিতে পৌছানাের জন্য প্রবল চেষ্টা করছি, কিন্তু পরমেশ্বর ভগবানের ধাম নিত্য চিন্ময় জগৎ সম্বন্ধে অনবহিত, অথচ তা উপলব্ধি করা কঠিন কিছু নয়।


পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম ধামকে ব্রহ্মসংহিতায় বর্ণনা করা হয়েছে ‘চিন্তামণি ধাম’ বলে, অর্থাৎ যেখানে সমস্ত বাসনা পরিপূর্ণ, চরিতার্থ হয়। গােলােক-বৃন্দাবন নামে  খ্যাত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেই পরম ধাম নানা দিব্য সুরম্য গৃহ-অট্টালিকায় পূর্ণ, যা চিন্তামণি নির্মিত। সেখানকার সমস্ত বৃক্ষগুলি “কল্পবৃক্ষ,” যা চাওয়া মাত্র যে কোনাে ধরনের আহার্য প্রদান করতে পারে। 


জড় জগতে একটি আম গাছ কেবল আমই দিতে পারে, কলা গাছ আমাদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য ডাবের জল দিতে পারে না। কিন্তু কল্পবৃক্ষ (Desire Tree) অনুরােধমাত্রই যে কোন খাদ্য, এমনকি যে কোন বস্তু সরবরাহ করতে পারে।


 সেই দিব্য ধামে গাভীগণ রয়েছে, যাদের বলা হয় সুরভী গাভী, এবং তারা চাওয়া মাত্রই যে কোনাে সময়ে যে কোন পরিমাণ দুধ সরবরাহ করতে পারে। ভগবানের এই ধামে শত সহস্র লক্ষ্মীগণ কর্তৃক ভগবান সেবিত হন, এবং তাঁকে বলা হয় গােবিন্দ, আদিপুরুষ, সর্বকারণের কারণ।


 লাবণ্যময়-তনু কিশাের শ্যামসুন্দর বেণু বাদন করেন (বেণুংকন্ত) বেণুবাদনরত প্রণয়কেলি বিলাসময় ভগবানের ত্রিভঙ্গললিত মূর্তি ত্রিজগদাকর্ষী; তাঁর  নয়নদ্বয় পদ্মের পাপড়ির মতাে আয়ত (অরবিন্দ-দলায়তাক্ষং),তাঁর  গায়ের রঙ জলভরা নবীন মেঘের মতাে ঘনশ্যাম। তাঁর  কমনীয় অঙ্গশােভা কোটি কোটি কামদেব কন্দর্পের সৌন্দর্যকেও পরাভূত করে (কন্দর্পকোটি কমনীয় বিশেষ-শােভং) । পরিধানে তাঁর পীতবাস ; গলদেশে বৈজয়ন্তী মালা ও তাঁর  কেশচূড়ায় শােভিত ময়ূর পুচ্ছ। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ তার নিজ ‘ধাম গােলক বৃন্দাবনের কেবল সামান্য আভাস মাত্র দিয়েছেন, যা চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ গ্রহলােক (Supermost Planet)।।


ব্রহ্মসংহিতায় তাঁর ধামের উজ্জ্বল বর্ণনা প্রদত্ত হয়েছে। বৈদিক শাস্ত্রে (কঠ উপনিষদ। ১/৩/১১) বলা হয়েছে যে পরমেশ্বর ভগবানের ধামের থেকে শ্রেষ্ঠতর কিছু নেই এবং সেই ধাম হচ্ছে জীবের পরম গন্তব্য। যখন কেউ সেটি প্রাপ্ত হয়, তখন তাকে আর কখনই এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না। এই পৃথিবীতে দিল্লী থেকে ৯০ মাইল দক্ষিণ পূর্বে  অবস্থিত বৃন্দাবন হচ্ছে সেই পরম গােল বৃন্দাবন ধামের প্রতিরূপ (Replica)। শ্রীকৃষ্ণ যখন এই পৃথিবীতে অবতরণ করেন, তখন তিনি বৃন্দাবন নামে অভিহিত ঐ বিশেষ স্থানে লীলাবিলাস করেন। ব্রহ্মসংহিতার (৫/৩৭) শ্লোকে বলা হয়েছে, গােলক এব নিবসতি অখিলাত্মভূত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিত্যকাল তার ধাম গােলক-বৃন্দাবনে বিরাজ করেন, তবুও তিনি সর্বব্যাপ্ত। এ জগৎ থেকেও তাঁর নিকট গমন করা যায়। এই সুযােগ দানের জন্যই ভগবান এ-জগতে এসে তার স্বয়ং রূপ, সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ  শ্রীকৃষ্ণ রূপ প্রকাশ করেন। 


এজন্য ভগবান কেমন, এ বিষয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনার কোনাে প্রয়ােজন নেই। তিনি অবতরণ করে তার নিত্যরূপ, শ্যামসুন্দর রূপ প্রকাশ করেন। অবশ্য, এই জগতের বদ্ধ জীবদের অনেককেই তাকে সাধারণ মানুষ মনে করে অবজ্ঞা করে থাকে, শ্রীকৃষ্ণ তাদেরকে মূঢ় বলে বর্ণনা করেছেন –অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতাঃ।।


চিদাকাশের উজ্জ্বল জ্যোতি বিচ্ছুরণের মধ্যে অসংখ্য দিব্য গ্রহলোেক ভাসমান। পরম ধাম কৃষ্ণলােক থেকে ব্রহ্মজ্যোতি নিঃসৃত হয়ে সর্বদিকে পরিব্যাপ্ত হয়, আর এই আনন্দময়, চিন্ময় গ্রহলােকগুলি, যা জড় নয়, ঐ রশ্মি-প্রভার মধ্যে ভাসতে থাকে। জড় আকাশে আমরা যদি সর্বোচ্চ লােক - ব্রহ্মলােকেও যাই, তাহলে ও আমরা দেখব জড় জাগতিক জীবনের মূল সমস্যাগুলি, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যু জরা-ব্যাধি সেখানেও রয়েছে। জড় ব্রহ্মাণ্ডের কোন গ্রহ জড় অস্তিত্বের এই চারটি অপরিহার্য দুর্দশা থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু চিজ্জগতে, ভগবদ্ধামে এইরকম কোনাে সমস্যা নেই, এবং ভগবান ভগবদগীতায় বলেছেন যে একবার সেখানে গেলে আর এই জড়জগতে ফিরে আসতে হয় না, জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হয় না; যৎগত্বা ন। নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।।


Subscribe For Latest Information






Comments

This Blog is protected by DMCA.com

Subscribe

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

Popular Posts

Email Subscription

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

EMAIL SUBSCRIPTION